ফরাসী ও বাঙালি শিল্পীর যুগলবন্দীতে কলকাতার দুর্গাপুজো মণ্ডপে ফুটে উঠেছে ঘাটের গল্প

ছবির উৎস, TAPAS DUTTA
- Author, রূপসা সেনগুপ্ত
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
- Published
- পড়ার সময়: ৭ মিনিট
"গঙ্গার ঘাটে আমি পুজো করতে দেখেছি, বাবার হাত ধরে শিশুর স্নান দেখেছি। সৎকারের পর অস্থি বিসর্জন করতেও দেখেছি।
"আমি ঘাটে বসেই জীবনের প্রতিটা ধাপ প্রত্যক্ষ করেছি। যে শান্তি একা ঘাটে বসে অনুভব করেছি, সেটা অন্য কোথাও নেই," বলছিলেন ফরাসী শিল্পী থমাস হেনরিয়ট।
ফ্রান্সের বেসান্সসঁতে বড় হয়েছেন, ফাইন আর্টস নিয়ে লেখাপড়াও সেখানেই। কিন্তু ভারতের নদীর ঘাটের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিবিড়। আর সেই সম্পর্কই তাকে টেনে এনেছে কলকাতার এক দুর্গাপূজার মণ্ডপে যেখানে তার চোখ দিয়ে কলকাতার স্মৃতি বিজড়িত ঘাটের গল্প প্রত্যক্ষ করবেন দর্শনার্থীরা।
গল্প বোনার জন্য জুটি বেঁধেছেন আরেক বাঙালি শিল্পীর সঙ্গে। তাদের ভাবনায় হাতিবাগান সর্বজনীন দুর্গোৎসব কমিটির পুজোর মণ্ডপে কলকাতার বিভিন্ন ঘাটের ছবি ফুটে উঠেছে।

পুজোর উদ্যোক্তাদের মধ্যে অন্যতম নীলোৎপল দত্তর কথায়, "আমাদের পুজোর থিম অথঃ ঘাটকথা। কলকাতার ঘাটগুলোর সঙ্গে বাংলার ইতিহাস এবং ঐতিহ্য জড়িয়ে রয়েছে। কিন্তু তাদের কথা আজ বিস্মৃত, অনেক ঘাটেরই সংস্কার প্রয়োজন।"
"কী অদ্ভুতভাবে শিল্পী থমাস হেনরিয়টের ভাবনার সঙ্গে আমাদের ভাবনা মিলে গিয়েছে। পুরোনো কলকাতা নিয়ে কাজ করছেন তিনি। বেনারসের ঘাট নিয়ে তার বহু কাজ রয়েছে। এই মণ্ডপে তার এক অপূর্ব শিল্পকলাও রাখা আছে।"

কলকাতার ঘাট ও তার গল্প

ছবির উৎস, SOUMYA GANGULY
কলকাতায় গঙ্গাঘাটগুলো কয়েক শতাব্দী প্রাচীন। আর্কিভিস্ট সুমিত ঘোষের কথায়, "লেখক রাধারমণ মিত্রের কলিকাতা দর্পণ, পোর্ট ট্রাস্টের দ্য স্টোরিজ অফ ঘাটস অফ রিভার হুগলী এবং পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য লেখ্যাগারের রাখা নথিতে বরাহনগর থেকে আদিগঙ্গা বা বর্তমানের দ্বিতীয় হুগলী সেতু পর্যন্ত অসংখ্য ঘাটের উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে কিছু ঘাট এখনো আছে, কিছু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে গেছে।"
তিনি জানিয়েছেন, কয়েক শতাব্দী প্রাচীন এই ঘাট তৈরির ভিন্ন ভিন্ন উদ্দেশ্য ছিল। তৎকালীন অভিজাত পরিবারের ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য কিছু ঘাট তৈরি হয়েছিল। কিছু ঘাট নির্মাণ হয়েছিল স্থানীয় বা ইউরোপীয় বণিকদের বাণিজ্যিক কাজের জন্য। কিছু আবার জনসাধারণের দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য তৈরি।
সুমিত ঘোষ বলেছেন, "বরাহনগর, কাশীপুর, শোভাবাজারে নির্মিত ঘাট হিন্দু ধর্মের পরম্পরা, কৌলীন্য এবং ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছিল। আবার বরাহনগরের ওলন্দাজ কুঠি ছিল, তাই সেখানকার ঘাটের নাম কুঠি ঘাট। এটা একটা ফেরিঘাট ছিল। এমন অজস্র ঘাটের কথা শোনা যায়।"

গঙ্গার ঘাট নিয়ে তথ্যচিত্র তৈরি করেছেন মি. ঘোষ।
তিনি জানিয়েছেন, একদিকে যেমন এই ঘাটগুলো মানুষের ধর্মীয় মনোভাবের সাক্ষী, তেমনই অনেক যুগান্তকারী মুহূর্তও প্রত্যক্ষ করেছে এই ঘাটগুলো।
ব্রিটিশ শাসিত সময়ে রানি রাসমণির জনহিতৈষী রূপের সাক্ষী থেকেছে গঙ্গার ঘাট। আবার সতীদাহ প্রথার চল এবং পরে সেই প্রথা বন্ধ হওয়ার ঘটনাও প্রত্যক্ষ করেছে।
"ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় বিপ্লবীদের আত্মত্যাগের সাক্ষী যেমন থেকেছে, কলকাতার গঙ্গার ঘাট তেমনই নকশাল আমলও প্রত্যক্ষ করেছে," বলেছেন দীনেশ দাশগুপ্ত। কলকাতার ইতিহাস নিয়ে কাজ করেছেন তিনি।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
শিল্পী তাপস দত্ত তেমনই কিছু গল্প বলতে চেয়েছেন হাতিবাগান সর্বজনীন দুর্গাপুজোর মণ্ডপে।
তার কথায়, "কলকাতার প্রতিটা ঘাটের নিজস্ব গল্প আছে। কোনোটায় ঔপনিবেশিক যুগে জাহাজ এসে দাঁড়াত, কোথাও নাটকের মহড়া চলত, কোনোটা ধনী জমিদার বাড়ির ঘাট, কোনোটা আবার স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। কোনো ঘাট মানুষের অন্তিম যাত্রার সাক্ষী।"
"ঘাটের সঙ্গে প্রজন্মের পর প্রজন্মের বন্ধুত্ব তৈরি হয়েছে এবং আজও তা অটুট রয়েছে।"
তবে তিনি মনে করেন, কলকাতার ঘাট নিয়ে খুব বেশি কথা হয় না। কিছুটা আক্ষেপের সুরে বলেছেন, "বেনারসের ঘাট নিয়ে যেভাবে কথা হয়, কলকাতার ঘাট সম্পর্কে হয় না। তথ্যচিত্র, আঁকা, চলচ্চিত্রে নানান সময়ে বেনারসের ঘাটের বিষয়ে তুলে ধরা হয়েছে কিন্তু কলকাতার ঘাটগুলো বিস্মৃতির পথে। সেই ভাবনা থেকেই আমাদের এই উদ্যোগ।"
কাজের জন্য উত্তর কলকাতার বিভিন্ন ঘাটে দীর্ঘক্ষণ সময় কাটিয়েছেন তাপস দত্ত এবং থমাস হেনরিয়ট।
ওই ফরাসী শিল্পীর কথায়, "কুড়ি বছর আগে কলকাতায় এসে প্রথমে গঙ্গার ঘাটে গিয়েছিলাম। সেই অভিজ্ঞতা ভোলার নয়। তারপর বহুবার এসেছি এখানে এবং কলকাতার ঘাটের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ততই গভীর হয়েছে।"

অথঃ ঘাটকথা
মাস তিনেক আগে থেকে শুরু হয়ে গিয়েছিল মণ্ডপসজ্জার কাজ। হাতিবাগানের এই পুজো মণ্ডপে ঢুকতেই সামনে চোখে পড়বে পিতৃপুরুষকে উদ্দেশ্য করে গঙ্গায় তর্পণ করছেন এক নারী।
মণ্ডপের দেওয়ালে কোনো ছবিতে দেখা যাচ্ছে দুর্গা প্রতিমা, কোথাও ব্রিটিশ আমলের নিমতলা ঘাটের ছবি, কোনো ঘাট ক্লান্ত মানুষের বিশ্রামের জায়গা হয়ে উঠেছে। কোথাও রঙ তুলিতে ফুটে উঠেছে শ্রীরামকৃষ্ণ এবং সারদা দেবীর ছবি। কোথাও আবার ভেসে উঠেছে শিশুদের খেলার মুহূর্ত।
এই ছবি এঁকেছেন পাঁচ তরুণ শিল্পী যাদের বেশিরভাগই কলকাতা আর্ট কলেজের ছাত্র। তাদেরই একজন ক্যানিঙয়ের মিলন মণ্ডল।
তিনি বলেছেন, "একজন ফরাসী শিল্পীর সঙ্গে কাজ করতে হবে শুনে ভয় পেয়েছিলাম। কিন্তু তার সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা দারুণ। ফ্রান্সে বেড়ে উঠলেও তার বাঙালি সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য বুঝতে এতটুকু সমস্যা হয় না।"

প্যান্ডেলের উপরে তাকালে দেখা যাবে ঘাটের সিঁড়ি। তার ধাপে রাখা কলসি, যা আবহমান জীবনের কথা বলে। আবার অন্যদিকে জীবনের অন্তিম ক্ষণের কথাও ফুটে উঠেছে মণ্ডপে। প্রতিমা ও তার সজ্জাতেও গল্প রয়েছে।
মি. দত্ত বলেছেন, "ঘাটের কাছে যে সমস্ত ঠাকুর দেখা যায়, তার আদলে তৈরি দুর্গা প্রতিমা। ঘাটে কার্ত্তিক ফেলে যায় অনেকে। মণ্ডপের কার্ত্তিক ঠাকুরের প্রতিমা সে কথা মাথায় রেখে তৈরি। এমন অনেক খুঁটিনাটি বিষয় রয়েছে থিমের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে।"
মণ্ডপের অন্যতম বড় আকর্ষণ ফরাসী শিল্পী থমাস হেনরিয়টের এক শিল্পকর্ম। তারই আঁকা কলকাতার বসুবাটির ঐতিহ্যমণ্ডিত ভবনের ছবির ডিজিটাল প্রিন্ট নিয়ে তার উপর সোনালী সুতোর বুনোন। আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে সিল্কের উপর বোনা হয়েছে ওই সুতো।

ছবির উৎস, MILAN MONDAL
মি. হেনরিয়টের কথায়, "বসুবাটির সঙ্গে কলকাতার ঘাটের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। সেখানে কাজ করতে গিয়ে আমি ইতিহাস ঘেঁটেছি এবং যত জেনেছি, তত মুগ্ধ হয়েছি। দুর্গাপুজোয় এই কাজ দর্শনার্থীরা দেখতে পাবেন এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি কী হতে পারে।"
এই প্রথম দুর্গাপুজোর মণ্ডপসজ্জার কাজ করেছেন তিনি।
থমাস হেনরিয়ট বলেছেন, "বাঙালিদের এই উৎসব আমাকে বরাবরই আকর্ষণ করেছে কিন্তু আমি যে একদিন এইভাবে তার অংশ হব তা ভাবিনি। তবে রাজি হওয়ার দু'টো কারণ। প্রথমত, বাংলার সাহিত্য, শিল্প-সংস্কৃতি এবং মনন আমাকে বরাবরই মুগ্ধ করেছে। দ্বিতীয়ত এর বিষয়বস্তু।"
বাংলার শিল্পীদের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে প্রশংসায় ভরিয়েছেন তিনি। তারপর বলেছেন, "এই তরুণ শিল্পীরা খুব ভাল কাজ করেছে। তাদের নিষ্ঠা এবং পরিশ্রম প্রশংসনীয়।"
'আমি ঘাটকে বাছিনি, ঘাট আমাকে বেছে নিয়েছে'

ছবির উৎস, MILAN MONDAL
পঠন-পাঠন শেষ করার পর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত ঘুরে ছবি আঁকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন মি. হেনরিয়ট। মরক্কো, লেবানন, সেই ভাবেই দুই দশক আগে ভারতে এসেছিলেন তিনি। তখনও জানতেন না ভারতের সঙ্গে তার যোগ এতটা গভীর হবে।
মি. হেনরিয়টের কথায়, "আগ্রা, চেন্নাই, ভোপালসহ একাধিক জায়গায় ছবির প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেছি। কিন্তু বেনারসের ঘাটে গিয়ে নতুনভাবে অনেক কিছু আবিষ্কার করি। আঁকার সঙ্গে যে আধ্যাত্মিকতার যোগ রয়েছে, সেটা ভারত আমাকে শিখিয়েছে আর বেনারসের ঘাটে তা বারে বারে উপলব্ধি করেছি।"
"আমি ভোর বেলায় উঠে ঘাটে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতাম। দেখতাম কীভাবে জীবনের শুরু থেকে শেষপর্যন্ত গঙ্গার ঘাট জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। আধ্যাত্মিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে থাকে। আমি শিবের ভক্ত হয়ে পড়ি।"
মাসের পর মাস বেনারসে কাটিয়েছেন মি. হেনরিয়ট। এই নিয়ে কথা বলতে বলতে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন তিনি।
তার কথায়, "সত্যি বলতে আমি ঘাটকে বাছিনি, ঘাটই আমাকে বেছে নিয়েছে।"
"ঘাটে বসে থাকাকালীন মরদেহ সৎকার করতে আসা মানুষের সঙ্গে কথা বলতাম। বহুদিন হয়েছে কাঠের আগুন না নেভা পর্যন্ত বসে থেকেছি। অস্থি বিসর্জন দেখেছি।"

ছবির উৎস, SOUMYA GANGULY
End of বিবিসি বাংলায় অন্যান্য খবর
ভারতের সঙ্গে যোগ
মি. হেনরিয়ট জানিয়েছেন, মরক্কো, লেবানন, ভারতের মতো দেশঘুরে ছবি আঁকার কারণ ছিল, সেখানকার স্থাপত্য ও শিল্পকলা।
তিনি বলেছেন,"ইউরোপীয় দেশের বদলে এই সমস্ত দেশ বেছে নেওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ শিল্পের প্রতি সেখানকার মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি। বিশেষত ভারত যে দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে শিল্পকলাকে দেখে তা আমাকে মুগ্ধ করেছে।"
"ভারতে এসে আমি শিখেছি শিল্পের সঙ্গে আধ্যাত্মিকতার যোগ আছে।"
মি হেনরিয়ট জানিয়েছেন, ভারতের সঙ্গে তার পরিবারেরও যোগ রয়েছে। তার বোন দুই সন্তানকে ভারতের মুম্বাই থেকে দত্তক নিয়েছেন।
"দত্তক নেওয়ার কাজ সম্পূর্ণ করার সময় আমিও তাদের সঙ্গে মুম্বাই গিয়েছিলাম। সেই থেকে শুধু আমার নয়, আমার পুরো পরিবারের ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।"
"এক এক সময় মনে হয়েছে ভারতে আসাই আমার ভবিতব্য ছিল।"








