মেলবোর্নের ফাইনালে পাকিস্তানকে যেভাবে হারিয়ে দিল ইংল্যান্ড

    • Author, রায়হান মাসুদ
    • Role, বিবিসি বাংলা
  • Published

দু'হাজার বাইশ সালে মেলবোর্নে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে বিরানব্বই ফিরিয়ে আনতে পারলো না পাকিস্তান।

দ্বিতীয়বারের মতো টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের শিরোপা জিতে নিয়েছে ইংল্যান্ড।

গত বছরের সেমিফাইনালিস্ট ইংল্যান্ড এবারে ১২ বছর পর টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ শিরোপা নিশ্চিত করলো। মেলবোর্নে ৮০ হাজার দর্শকের উপস্থিতিতে ম্যাচের শুরুতে ব্যাট করে পাকিস্তান ১৩৮ রান তোলে।

প্রথম ইনিংসের পরেই ক্রিকেট বিশ্লেষকদের অনেকে বলছিলেন, এই সংগ্রহ যথেষ্ট হবে না।

শেষ পর্যন্ত খানিকটা নাটকীয়তার পরে এই সংগ্রহ পাকিস্তানের জন্য যথেষ্ট হয়নি, এক ওভার হাতে রেখে জয় তুলে নিয়েছে ইংল্যান্ড।

পাকিস্তানের বোলিং ম্যাচ ধরে রেখেছিল

টুর্নামেন্ট জুড়েই পাকিস্তানের বোলিং ছিল উঁচু মানের। ব্যাট হাতে যখন বড় তারকারা জ্বলে উঠতে পারেনি পাকিস্তানের বোলাররা ক্ষতি পূরণ করে ম্যাচ জিতিয়ে এনেছেন।

বিশেষত, বাংলাদেশের বিপক্ষে অল্প রানের টার্গেটেও পাকিস্তানের ব্যাটসম্যানরা ভুগছিলেন একটা সময় পর্যন্ত।

ফাইনাল ম্যাচেও খুব একটা ব্যতিক্রম হয়নি পাকিস্তান গোটা ২০ ওভার ব্যাট করে মাত্র ১৩৮ রান তোলে।

পাকিস্তানের বোলাররা অন্তত ১৫ ওভার পর্যন্ত ম্যাচে রেখেছিল দলকে।

তখনও মনে হয়নি ইংল্যান্ড খুব সহজে এই ম্যাচটা জিতবে।

বিশেষত, হারিস রওফ ও নাসিম শাহ’র বোলিং প্রদর্শনী ছিল দেখার মতো।

হারিস রওফ ইংল্যান্ডের অধিনায়ক জস বাটলার ও ফিল সল্টের উইকেট নিয়ে নেন।

দুজনই দারুণ শুরু করেছিলেন।

নাসিম শাহ সুইং বোলিংয়ের পসরা সাজান, পুরো চার ওভার বল করে ১৫টি ডট বল দেন নাসিম শাহ। মাঝের ওভারগুলোতে তাকে খেলা বেশ কঠিন হয়ে যাচ্ছিল।

ক্রিকেট উপস্থাপক হারশা ভোগলে টুইটারে লেখেন, “পাকিস্তানের সংগ্রহ খুবই কম। পাকিস্তানের বোলিংয়ের কারণে এটাকে একটু ভালো দেখাচ্ছে।”

শাহীন শাহ’র চোট

শাহীন শাহ আফ্রিদি বল হাতে ভালো শুরু এনে দেয়ার জন্য পরিচিত। আজও দুর্দান্ত এক বলে অ্যালেক্স হেইলসকে বোল্ড করে পাকিস্তানকে অল্প পুঁজিয়ে নিয়েও আশা দেখানো শুরু করেছিলেন।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি তার কোটার চার ওভার শেষ করতে পারেননি।

ম্যাচের ১২ ওভারের তৃতীয় বলে হ্যারি ব্রুক শাদাব খানের বল তুলে মারতে গিয়ে সোজা শাহীন শাহ আফ্রিদির হাতে ক্যাচ দেন।

এই ক্যাচ ধরার পর আফ্রিদি বল হাতে নিয়েই মাঠে শুয়ে পড়েন, সতীর্থরা কাছে গিয়ে দ্রুত মেডিক্যাল টিমের দিকে ইশারা করেন।

জনপ্রিয় ক্রিকেট ওয়েবসাইট ইএসপিএনক্রিকইনফো লিখছে আফ্রিদি হাঁটুতে চোট পেয়েছিলেন।

এরপর চিকিৎসা নিয়ে তিনি মাঠেও ফেরেন, উপস্থিত পাকিস্তান সমর্থকরা উল্লাসে ফেটে পড়েন তখন।

কিন্তু শাহীন শাহ আফ্রিদি বল হাতে নিয়ে এক বলের বেশি করতে পারেননি, টেলিভিশন পর্দায় দেখা যাচ্ছিল তিনি চোটে কাতরাচ্ছিলেন।

সেই ওভারটি সম্পন্ন করতে শাহীন শাহ’র জায়গায় বল হাতে নেন ইফতিখার আহমেদ।

তিনি বাকি ৫ বলে ১৩ রান নেন।

এই ওভারের আগে ইংল্যান্ডের ৩০ বলে ৪১ রান প্রয়োজন ছিল, সেখান থেকে প্রয়োজনীয় রান দাঁড়ায় ২৪ বলে ২৮।

এখানেই পাকিস্তানের হাত থেকে ম্যাটা হাতছাড়া হয়ে যায়।

এই খানে নায়ক বনে যান বেন স্টোকস

ক্রিকেট উপস্থাপক হারশা ভোগলে টুইটারে লিখেছেন, খেলার সময়, “চাপ মাথায় নিয়ে পৃথিবীতে বেন স্টোকসের চেয়ে ভালো ক্রিকেটার আর কেউ আছেন? সবসময় আছেন তিনি। খেলোয়াড় বটে।”

বেন স্টোকস এমনই এক ইনিংস খেলেছেন।

মেলবোর্নে তিনি লর্ডস ফিরিয়ে এনেছেন, ২০১৯ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপের ফাইনালে চাপের মুখে এমন এক ইনিংস খেলে তিনি নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ইংল্যান্ডকে সমতায় ফিরিয়েছিলেন।

বিবিসি ক্রিকেটের ধারাভাষ্যকার অ্যালেক্সজান্দ্রা হার্টলের মতে, বেন স্টোকসের জন্মই হয়েছে এসব পরিস্থিতিতে খেলার জন্য।

বেন স্টোকস যখন মাঠে নামেন তখন ৩২ রানে ২ উইকেট নেই।

সেখান থেকে ৪৯ বলে ৫২ রানের এক ইনিংস খেলেন স্টোকস।

স্টোকসের ব্যাটিং ফর্ম তেমন বলার মতো ছিল না, টুর্নামেন্টের আগে খারাপ পারফর্ম করেছেন ব্যাট হাতে এবং পুরো টুর্নামেন্টেই স্টোকস ব্যাট হাতে তেমন রান পাচ্ছিলেন না।

সেই স্টোকস খেললেন এমন একদিনে যেদিন তাকে দলের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।

বিবিসি স্পোর্টের ম্যাথু হেনরি মেলবোর্ন থেকে লিখেছেন, “বেন স্টোকস ইংল্যান্ডের ক্রিকেটের বর্ণাঢ্য ইতিহাসে নিজের জায়গা আরও পোক্ত করলেন এই ৫২ রানের ইনিংসে।”

স্যাম কারান ম্যাচ সেরা ও টুর্নামেন্ট সেরা

আজ মেলবোর্নে শুরুতে ব্যাট করতে নেমে পাকিস্তানের ব্যাটিং প্রথম ওভার থেকেই ছিল নড়বড়ে।

এই নড়বড়ে ব্যাটিংয়ের সুযোগ নেন স্যাম কারান।

২৪-বছর বয়সী এই বাঁ হাতি ফাস্ট বোলার বল হাতে নিয়ে নিজের দ্বিতীয় ওভারেই মোহাম্মদ রিজওয়ানের উইকেট নিয়ে নেন।

প্রথম স্পেলে তিনি দুই ওভারে পাঁচ রান দিয়ে এক উইকেট নেন।

দ্বিতীয় স্পেলেও তিনি মাত্র সাত রান খরচ করে উইকেটে সেট হওয়া শান মাসুদকে প্যাভিলিয়নে ফেরান।

শান মাসুদ তখন ২৮ বলে ৩৮ রানে ছিলেন, পাকিস্তানের রানের চাকা মাত্রই সচল করছিলেন এই মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান।

ম্যাচ সেরার পুরস্কার নিয়ে স্যাম কারান বলেন, “স্টোকস যে ইনিংস খেলেছে, আমার মনে হয় আমার এটা প্রাপ্য না। এটা অনেক বিশেষ একটা মুহূর্ত।”

স্যাম কারান একই সাথে টুর্নামেন্ট সেরার পুরস্কারও পেয়েছেন।

ম্যাচ শেষে টেলিভিশনে সাক্ষাৎকারে স্যাম পুরস্কার হাতে বলেন, “আমি ভাষা হারিয়ে ফেলেছি।”

এই শিরোপা দিয়ে ইংল্যান্ড সাদা বলের সেরা দল হিসেবে স্বীকৃতি পেলো?

ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক মাইকেল ভন লিখেছেন, “ইংল্যান্ড এখন সাদা বলের ক্রিকেটে সেরা দল। তাদের এক ঝাঁক দুর্দান্ত ক্রিকেটার আছেন, যাদের এখন সাদা বলের দুটি বিশ্বকাপের শিরোপাই আছে।"

বেন স্টোকসের আলাদা করে প্রশংসা করেছেন ভন, “বেন স্টোকসের মধ্যে ইংল্যান্ড এমন এক ক্রিকেটার পেলো যে বড় মুহূর্ত কীভাবে জিতে নিতে হয় সেটা জানেন।”

বড় দলের বড় ব্যক্তিত্বের দরকার হয়, ইংল্যান্ডের তা আছে।

হারশা ভোগলেও লিখেছেন, “ইংল্যান্ড টুর্নামেন্টের সেরা দল হিসেবেই শিরোপা জিতলো। তারা ধীরে শুরু করেছে, ধীরে ধীরে ভালো করেছে এবং শেষ পর্যন্ত জিতে নিয়েছে।”

তিন বছর আগে ওয়ানডে ক্রিকেটের শিরোপা জয়ের পর এবারে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের শিরোপা জয় ইংল্যান্ডের সেই প্রক্রিয়ারই একটা অর্জন যেটা তারা ২০১৫ সাল থেকে শুরু করেছিল। সেবার ওয়ানডে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের কাছে হেরে বাদ পড়ার পর ইংল্যান্ড সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিকে, ভিন্ন পন্থায় একটা দল ঘোষণা করেছিল, অধিনায়ক থেকে শুরু করে ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে যেসব পরিবর্তন এনেছিল তার ফল ইংল্যান্ড পেল এবারে।

তিন বছরে দুটো সাদা বলের বিশ্বকাপ- দুই ফরম্যাটে।

এর মধ্যে জস বাটলার, বেন স্টোকস, মঈন আলী, ক্রিস ওকস, আদিল রাশিদ এবং মার্ক উড- এই কজন ক্রিকেটার ২০১৯ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপের স্কোয়াডেও ছিলেন।