মাদক কারবারের অভিযোগে নির্যাতন, কেন আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছেন অনেকে?

Published
পড়ার সময়: ৫ মিনিট

হাত পা বেঁধে মাটিতে ফেলে পেটানো হচ্ছে এক ব্যক্তিকে। আর কয়েকশ মানুষ ভিড় করে সেই দৃশ্য দেখছেন, অনেকে ভিডিও ধারণ করছেন।

কোথাও আবার লাঠি কিংবা ইট দিয়ে কয়েকজন মিলে বেধড়ক পেটাচ্ছেন একজনকে। রক্তাক্ত অবস্থায় মাফ চাওয়ার পরও ছাড় মিলছেনা। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তির বাড়িঘরেও হামলার ঘটনা ঘটেছে।

সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে এমন একাধিক ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। যেগুলো মাদক ব্যবসায়ী কিংবা মাদক সেবিদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং ফরিদপুর জেলার এমন তিনটি ঘটনার খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এগুলো মূলত মাদক ব্যাবসা সংশ্লিষ্ট। কোথাও মাদক কারবারির আবার কোথাও মাদকসেবনের অভিযোগ তুলে কথিত অপরাধীকে নিজেরাই শাস্তি দিয়েছেন এলাকাবাসী।

যদিও এসব ঘটনায় আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন যে, বিচার যদি এভাবেই হয় তাহলে আইন-আদালতের কী প্রয়োজন?

এক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। যদিও পুলিশ বলছে, এমন ঘটনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে তারা। অপরাধীদের ধরতে অভিযান অব্যাহত রাখার কথাও জানিয়েছে পুলিশ।

এদিকে, বিচার ছাড়াই অপরাধীকে শাস্তি দেওয়া এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এসব ঘটনা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে ভালো বার্তা দেয় না বলেই মনে করেন মানবাধিকার কর্মী এবং বিশ্লেষকরা।

"আমরা তো জঙ্গলে বসবাস করছি না- অপরাধী হলে তার বিচারে দেশে আইন আছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আছে। নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়ার অধিকার কারো নেই," বিবিসি বাংলাকে বলেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ফৌজিয়া করিম ফিরোজ।

তিনি বলছেন, অপরাধী দাবি করে যেকারো বিরুদ্ধে নিজেরাই ব্যবস্থা নেওয়ার এই প্রবণতা, মব বা বিশৃঙ্খল জনতার হাতে নিরপরাধ ব্যক্তির আক্রান্ত হওয়ার সুযোগও বাড়িয়ে তুলছে।

ছড়িয়েছে একাধিক ভিডিও

এক ব্যক্তিকে প্রকাশ্যে হাত-পা বেঁধে নির্যাতনের একটি ভিডিও সম্প্রতি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ওই ভিডিওটি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার নারুই বাজার এলাকার বলে জানা গেছে।

এই ঘটনায় সালিশ বৈঠকের নামে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন অনেকে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গ্রামের মাদক নির্মূলে গঠিত একটি কমিটির উদ্যোগে বৃহস্পতিবার ওই সালিশের আয়োজন করা হয়েছিল।

সালিশের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অভিযুক্ত ওই ব্যক্তিকে হাত-পা বেঁধে তার পরিবারের সামনেই পেটানো হয়।

নারুই গ্রামের একাধিক বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অভিযুক্ত ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরেই মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বলে স্থানীয়ভাবে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি তার বিরুদ্ধে থানায় একাধিক মামলা রয়েছে বলেও বিবিসি বাংলাকে নিশ্চিত করেছে পুলিশ।

মূলত মাদক ব্যবসায় জড়িত থাকার কারণেই গ্রাম্য সালিশে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল বলে জানান ওই এলাকার ইউনিয়ন মেম্বার আবু হানিফ।

অতীতেও মাদকের কারবার বন্ধ না করায় অতীতেও তাকে গ্রাম থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল বলেও জানান তিনি।

"তারে পুলিশ নিয়া যায়, কয়দিন পরই আবার ফিরে ব্যাবসা শুরু করে। ছয়মাস আগে তাকে গ্রাম থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল কিন্তু সে আবার একই কাজ শুরু করছে," বলেন মি. হানিফ।

এই ঘটনায় পুলিশের বিরুদ্ধেও অভিযোগ তুলেছেন ওই গ্রামের বাসিন্দারা। যদিও পুলিশ বলছে, অভিযুক্তকে আইনের আওতায় আনতে তারা চেষ্টা করছে।

এদিকে সালিশ বৈঠকের নামে নির্যাতনের ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ওই গ্রামের অনেকেই বলছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী থাকতে গ্রামের বাসিন্দারা কিভাবে আইন নিজেদের হাতে তুলে নিলেন।

এ বিষয়ে নবীনগর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পিয়াস বসাক বলছেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

"আমরা এই ঘটনার সবগুলো দিকই বিবেচনা করছি, মাদকের বিরুদ্ধেও যেমন ব্যবস্থা নেওয়া হবে তেমনি যদি কারো বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ থাকে সেটিও তদন্ত করা হবে," বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।

এদিকে, সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া পৃথক আরও কয়েকটি ভিডিয়ো নিয়ে অনেকটা একই রকম অভিযোগ পাওয়া গেছে।

ফরিদপুরের ভাঙা এবং নগরকান্দা উপজেলায়ও মাদক কারবারের অভিযোগে একাধিক ব্যক্তিকে বেধড়ক পেটানোর ঘটনা ঘটেছে।

এমনকি ফরিদপুরে সোনাখোলা গ্রামে অভিযুক্তের বাড়িঘরে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও আগুন ধরিয়ে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

মানুষ কেন আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে?

সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া কিংবা ফরিদপুরের এসব ভিডিওতে আইন বা বিচার ব্যবস্থার তোয়াক্কা না করে অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষকেই কথিত অপরাধীকে শাস্তি দিতে দেখা গেছে।

অথচ আইন অনুযায়ী এই ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং বিচার বিভাগের। তাহলে মানুষ কেন আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে?

যদিও অপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযান অতীতের চেয়ে আরও জোরালো হয়েছে বলে দাবি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর।

ফরিদপুর জেলা পুলিশ সুপার মো. নজরুল ইসলাম বলছেন, মাদক কারবারিদের শাস্তি দেওয়ার নামে যারা আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছেন তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিবিসি বাংলাকে তিনি বলছেন, "অপরাধী হলেও তার আইনি অধিকার রয়েছে। তাদের বাড়িঘরে হামলা করাও একটা অপরাধ। আইনও এই বিষয়টিকে কখনই প্রশ্রয় দেয় না।"

এক্ষেত্রে অবশ্য দেশের আইন ও বিচার ব্যবস্থার ওপর আস্থার সংকটের কথা বলছেন মানবাধিকারকর্মী এবং আইনজীবীদের অনেকে।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ফৌজিয়া করিম ফিরোজ বলছেন, অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করার মাধ্যমে আইনের প্রতি মানুষের আস্থা ফেরাতে হবে।

"অনেক ক্ষেত্রে বিচার পেতে বিলম্ব হয়, অনেক সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধেও কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ার অভিযোগ ওঠে, এগুলো বন্ধ করা জরুরি," বলেন তিনি।

তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যবস্থা নিচ্ছে না বা দেরি হচ্ছে এমন অভিযোগ বা কোনো অজুহাতেই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সুযোগ নেই বলেও উল্লেখ করেন মিজ ফিরোজ।

তিনি বলছেন, "আপনার অধিকার নাই আইন নিজের হাতে তোলার। কেউ অপরাধ করলে আইন আছে, মব করে ইচ্ছা হলেই কিছু করার সুযোগ নেই।

এক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে যদিও অভিযোগ থাকে তারও প্রতিকার আইনে রয়েছে বলে জানান তিনি।

"যদি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যবস্থা না নেয় তাহলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে। তাদের ঊর্ধ্বতনরা রয়েছেন, সর্বোপরি আদালত রয়েছে," বলেন তিনি।

আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এই প্রবণতা থামাতে এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলছেন সুপ্রিম কোর্টের এই আইনজীবী।

তিনি বলছেন, "আইনের নিজেদের হাতে তুলে নেওয়ার এই সুযোগ অনেকে ব্যাক্তিস্বার্থ হাসিলে কাজে লাগাতে পারে। এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে সামাজিক বিশৃঙ্খলা বাড়বে," বলেও মনে করে মিজ ফিরোজ।